"ক্রীড়া হলে পেশা,পরিবার পাবে ভরসা"এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ৩০ মার্চ ২০২৬ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে ক্রীড়া কার্ড ও ভাতা প্রদান কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। প্রথম ধাপে তিনি ১২৯ জন ক্রীড়াবিদের হাতে ক্রীড়া কার্ড তুলে দেন, যার মাধ্যমে র্যাংকিং এর ভিত্তিতে কার্ডধারী ক্রীড়াবিদরা মাসে এক লক্ষ টাকা ক্রীড়া ভাতা পাচ্ছেন। দ্বিতীয় ধাপে ১৯ এপ্রিল ২০২৬ জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি) অডিটোরিয়ামে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক আরও ১৭১ জন খেলোয়াড়ের হাতে ক্রীড়া কার্ড ও ভাতা তুলে দেন। দুই ধাপে এ সুবিধার আওতায় এসেছেন ৩০০ ক্রীড়াবিদ, যাদের মধ্যে রয়েছেন বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ে গড়ে ওঠা শিক্ষায়তন কোয়ান্টাম কসমো স্কুল ও কলেজের ৭ জন।
"অলিম্পিকে সোনা আমরা জিতবই"এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে ২০১২ সালে বাংলাদেশ জিমন্যাস্টিকস ফেডারেশনের সহযোগিতায় কোয়ান্টাম কসমো স্কুল ও কলেজে শুরু হয় "আমরা পারি জিমন্যাস্টিকস"কার্যক্রম।প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই বাংলাদেশ জিমন্যাস্টিকস ফেডারেশনের সহায়তায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কোচদের তত্ত্বাবধানে এই প্রতিষ্ঠানের জিমন্যাস্টরা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে আসছেন। গত এক যুগে জাতীয়ভাবে আয়োজিত বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় প্রশংসনীয় দক্ষতা ও পারদর্শিতা প্রদর্শন করে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ২১৮টি স্বর্ণসহ মোট ৫৫৬টি পদক জিতে দেশের শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে কোয়ান্টাম।
পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম থানচি এলাকার জুমচাষি পরিবারের সন্তান উহাইমং মার্মা ২০১১ সালে মাত্র পাঁচ বছর বয়সে কোয়ান্টাম কসমো স্কুল ও কলেজে ভর্তি হন। এ প্রতিষ্ঠানের জিমনেসিয়ামে ২০১৩ থেকে শুরু করেন জিমন্যাস্টিকস চর্চা। বর্তমানে তিনি এইচএসসি পরীক্ষার্থী এবং জাতীয় জিমন্যাস্টিকস দলের একজন চৌকস জিমন্যাস্ট।২০১০ সালে কোয়ান্টাম কসমো স্কুল ও কলেজের সূচনা শ্রেণিতে ভর্তি হন রাজীব চাকমা। ২০১২ সালে এখানেই জিমন্যাস্টিকসে হাতেখড়ি হয় তার। ২০২৪ সালে কোয়ান্টাম থেকেই উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এখন তিনি পড়ছেন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। শৈশবের সেই বিদ্যাপীঠের টিনের ঘরে সীমিত সুবিধার মাঝে জিমন্যাস্টিকস চর্চা শুরু করে এখন তিনি বাংলাদেশ জাতীয় দলের জিমন্যাস্ট, অংশ নিয়েছেন অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায়।
রাঙামাটির নানিয়ার চর ইউনিয়নের গলাছড়ি গ্রামের নিঝুম খীসা ২০১০ সালে কোয়ান্টাম কসমো স্কুল ও কলেজের সূচনা শ্রেণিতে ভর্তি হন। এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১৪ বছর লেখাপড়া করার পর এখান থেকেই উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ২০২৪ সালে। জিমন্যাস্টিকসে তার পথচলা শুরু হয় স্কুলে পড়ার সময়েই। কোয়ান্টামের হয়ে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছেন তিনি।
সাংখেঅং খুমী কিতং বাবার হাত ধরে ২০০৫ সালে মাত্র ৩ বছর বয়সে কোয়ান্টাম কসমো স্কুল ও কলেজে শিশু শ্রেণিতে ভর্তি হন। এখানকার জিমনেসিয়ামে তার জিমন্যাস্টিকস অনুশীলন শুরু হয়। সে-সময় থেকেই বিভিন্ন আঞ্চলিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জিমন্যাস্টিকসে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি। ২০২০ সালে কোয়ান্টাম কসমো স্কুল ও কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন কিতং।
৩০ মার্চ ২০২৬ উহাইমং মার্মা ও রাজীব চাকমার হাতে ক্রীড়া কার্ড তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এছাড়া নিঝুম খীসা ও সাংখেয়ং খুমী ১৯ এপ্রিল ২০২৬ যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হকের কাছ থেকে ক্রীড়া কার্ড গ্রহণ করেন।প্রাণবন্ত পদচারণা টেবিল টেনিসেও ৩০ আগস্ট ২০২৫ কোয়ান্টাম কসমো স্কুল ও কলেজের টেবিল টেনিস একাডেমি ভবন উদ্বোধন করা হয়। এ খেলায় আঞ্চলিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোয়ান্টাম কসমো স্কুল ও কলেজের রয়েছে অসাধারণ সাফল্য। ২০১৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত জাতীয় স্কুল ও মাদ্রাসা ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় টেবিল টেনিসে দ্বৈত (বালক) ইভেন্টে ধারাবাহিক চ্যাম্পিয়নশিপ অক্ষুণ্ণ রাখে কোয়ান্টাম। ২০২০, ২০২২ ও ২০২৩ সালে টেবিল টেনিসে দ্বৈত (বালিকা) ইভেন্টে এবং ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে একক (বালিকা) ইভেন্টে টানা চ্যাম্পিয়ন হয়ে দুটিতেই অর্জন করে হ্যাট্রিক শিরোপা।
রাঙামাটির রাজস্থলীর দুর্গম চুশাক পাড়ার খই খই সাই মার্মা বর্তমানে দেশের অন্যতম সেরা টেবিল টেনিস তারকা। ২০১৫ সালে ৮ বছর বয়সে কোয়ান্টাম কসমো স্কুল ও কলেজে ২য় শ্রেণিতে ভর্তি হন খই খই। নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করার পর তিনি বিকেএসপি-তে স্থানান্তরিত হন। ২০১৮ সাল থেকে তিনি জেলা, উপজেলা এবং বিভাগীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে শুরু করেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের জন্য অনন্য সম্মান বয়ে আনা এই তারকা খেলোয়াড় বর্তমানে র্যাংকিং-এ এক নম্বর অবস্থানে রয়েছেন। ৩০ মার্চ ২০২৬ প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে মাসিক এক লক্ষ টাকার ক্রীড়া কার্ড গ্রহণ করেছেন তিনি।
২০০৮ সালে নিজ বাড়ি থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরের কোয়ান্টাম কসমো স্কুল ও কলেজে মাত্র ৩ বছর বয়সে সূচনা শ্রেণিতে রামহিমলিয়ান বমকে ভর্তি করে দেন তার বাবা। ২০১২ সালে শিক্ষার্থীদের টেবিল টেনিস শেখানোর উদ্যোগ গ্রহণ করে কোয়ান্টাম। তখন থেকেই তিনি আঞ্চলিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করতে থাকেন। ১৯ এপ্রিল ২০২৬ ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হকের কাছ থেকে ভাতা ও কার্ড গ্রহণ করেন রামহিম।
ছেলে ও মেয়েদের ভলিবল অনুশীলনের জন্য এ শিক্ষাঙ্গনে রয়েছে পৃথক ভলিবল মাঠ। ইতোমধ্যে কোয়ান্টামের ভলিবল খেলোয়াড়রা অর্জন করেছেন আঞ্চলিক ও জাতীয় সাফল্য। মৌমৌ খই মার্মা তাদের একজন। ২০১৬ সালে কোয়ান্টাম কসমো স্কুল ও কলেজে ২য় শ্রেণিতে ভর্তি হন পিতৃহারা মৌমৌ খই। এখান থেকেই মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ২০২৫ সালে। জাতীয় নারী ভলিবল দলের এই কৃতী সদস্যকে ৩০ মার্চ ২০২৬ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও ক্রীড়া কার্ড প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন শিক্ষাসেবা কার্যক্রমের ইনচার্জ ছালেহ আহমেদ বলেন, "জাতিগতভাবে অলিম্পিকে স্বর্ণ জয়ের লক্ষ্যে ২০১০ সাল থেকে 'অলিম্পিকে সোনা আমরা জিতবই'- বাক্যটিকে জাতীয় পর্যায়ে জনপ্রিয় করে তোলে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন।
তিনি আরো জানান,কোয়ান্টাম কসমো স্কুল ও কলেজের ক্রীড়াবিদেরাও এই বাক্যটিকে নিজেদের স্বপ্ন হিসেবে লালন করছেন দীর্ঘদিন ধরে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ক্রীড়াবিদদের পেশাগত স্বীকৃতি, ক্রীড়া ভাতা ও ক্রীড়া কার্ড প্রদানের এই মহতী উদ্যোগে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে ও ক্রীড়াবিদদের মধ্যে যে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে, যে আত্মবিশ্বাস ক্রীড়াবিদদের মধ্যে তৈরি হয়েছে, তাতে বাংলাদেশও অলিম্পিকে স্বর্ণ জিতবে ইনশাআল্লাহ।"